যেকোনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ব্যাংক বা আর্থিক খাত। এ খাতের সুস্থ বিকাশ অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনে। যে দেশের ব্যাংক খাত যত বেশি নিয়মতান্ত্রিক সে দেশ তত দ্রুত সমৃদ্ধ হয় এবং অর্থনীতি সচল থাকে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। মূলত খেলাপি ঋণের কারণেই ব্যাংকে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এটি চলমান আছে। খেলাপি ঋণ থেকে মুক্তি বা এর প্রকোপ কমিয়ে আনার মধ্যে নিহিত আছে আর্থিক খাতের সমস্যা সমাধানের উপায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। এ সংখ্যার সঙ্গে কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নেয়া ঋণ ও অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করা হলে পরিমাণটা আরো অনেক বেশি। অনেকের মতে, এর পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। গত আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের তৃতীয় কোয়ার্টারে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছে এবং যদিও এটি কার্যকর হবে ২০২৫ সালের মার্চ থেকে। বর্তমান খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় কোনো ঋণ ছয় মাস অনাদায়ী থাকলে খেলাপি হয় (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে মেয়াদি ঋণ নয় মাস) কিন্তু নতুন সংজ্ঞায় সব ধরনের ঋণে তিন মাস অনাদায়ী থাকলে খেলাপি বলে গণ্য হবে। এ নতুন সংজ্ঞায় বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা নেয়। তথ্যমতে, গত মার্চের শেষে অর্থঋণ আদালতে দেশের ৬০টি ব্যাংকের মোট মামলার সংখ্যা ২ লাখ ৭ হাজার ৭৯৩। প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করার জন্য ব্যাংকগুলো এসব মামলা করেছে। ঋণ প্রধানত খেলাপি হয় ঋণের ঝুঁকি পর্যালোচনার দুর্বলতায়, সঠিক কাঠামো মেনে ঋণ প্রদানের অক্ষমতায়, ঋণের বিপরীতে সঠিক ও কার্যকর জামানতের অভাব থাকলে বা ব্যবসায়ের ক্যাশ ফ্লো ঋণ ফেরতের জন্য পর্যাপ্ত না হলে। আমাদের দেশে অবশ্য রাজনৈতিক আনুকূল্যে প্রদত্ত ঋণ বা আদিষ্ট হয়ে ঋণ প্রদানের পরিমাণটাও কম নয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত কিংবা সরকার-ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় এ ঘটনা বেশি ঘটে। খেলাপি ঋণের আরেকটি খারাপ দিক হচ্ছে এটি নিজে তো আয় করতেই পারে না, বরং এটি ভালো ঋণের মাধ্যমে অর্জিত আয়কেও গ্রাস করে নেয়। অর্থাৎ এটি দুইভাবে ব্যাংকের ক্ষতি করে—প্রথমত সে নিজে অনুপার্জনক্রম হয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয়ত ভালো ঋণের আয়ে ভাগ বসায়। তাই খেলাপি ঋণ ব্যাংকের জন্য সর্বদা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খেলাপি ঋণ নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখার জন্য তাই ব্যাংকগুলোকে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়। অন্য কথায় বলা যায় খেলাপি ঋণ ক্যান্সারের মতো। যত দ্রুত সম্ভব এর বিস্তার রোধ করতে হবে। প্রথমত, নতুন করে যেন আর ঋণ খেলাপি না হয় তার জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে অর্থাৎ ভালো গ্রাহক নির্বাচনে ঋণদাতাদের সচেষ্ট হতে হবে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোকে পথ খুঁজতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রয়োজনে বিশেষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার ব্যবস্থা করা। আমাদের দেশে দেখা যায়, অর্থঋণ আদালত বা নিম্ন আদালত কোনো একটি সিদ্ধান্ত দেয়ার পর গ্রাহক উচ্চ আদালতে রিট করে বসে থাকল। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকল। এ ব্যবস্থারও পরিবর্তন দরকার। কোন কোন ক্ষেত্রে চাইলেও রিট করা যাবে না তা নির্ধারণ করে দেয়া দরকার। অর্থঋণ আদালতের পরিসর বাড়িয়ে দ্রুত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খেলাপি ঋণ আদায়কারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানানো যাবে না। পাসপোর্ট জব্দ করে রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ গ্রাহক এবং তার পরিবার যেন নতুন কোনো সম্পদ আহরণ করতে না পারে সে জন্য ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে বিদ্যুৎ, পানিসহ সকল প্রকার ইউটিলিটি সুবিধা বাতিল করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। খেলাপি ঋণগ্রহীতা, তার প্রতিষ্ঠান এবং তার পরিবাবের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দসহ যাবতীয় সহায়-সম্পত্তি ব্যাংকের অনুকূলে হস্তান্তর করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সম্পদ বিক্রি করে পুরো ঋণের অর্থ আদায় করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অন্যান্য দেশী-বিদেশী স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে তা বিক্রি করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রচলিত আইনে সেটা সম্ভব না হলে আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। সিন্ডিকেট ঋণ দেয়ার মতো করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট করে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়ে এগিয়ে আসতে হবে। মোদ্দা কথা খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারের সক্রিয় ও আন্তরিক সহযোগিতা এক্ষেত্রে একান্ত আবশ্যক। সরকারকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। সরকার আন্তরিক হলে খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধান খুব কঠিন হবে না। যেহেতু বর্তমানে খেলাপি ঋণ অত্যধিক বেড়ে গেছে তাই আগামী তিন বছর খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য একটি বিশেষ কোর্ট পরিচালনা করা যেতে পারে। দেশের অর্থনীতির প্রয়োজনে এখনই এটি করা দরকার।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক